নারীর মাসিক ও মানসিক স্বাস্থ্য





শরীরের কোথাও কেটে ছিঁড়ে গেলে অথবা কোন রোগ হলে আমরা ব্যস্ত হয়ে চলে যাই চিকিৎসকের কাছে কিংবা স্থানীয় কোন ঔষধালয় থেকে নিয়ে নেই প্রাথমিক চিকিৎসা। কিন্তু এমনও কিছু বিষয় থাকে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না বা তা কোন যন্ত্রের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না বলে তার সঠিক পরিচর্যা করা হয় না। প্রবল মানসিক চাপ কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ফলে তৈরি হওয়া অস্থিরতা বাহ্যিকভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় না বলে দিনের পর দিন মানুষ তা বহন করে যা তার প্রাত্যহিক কর্মকা-ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশের পূর্ণবয়সী মানুষের শতকরা ১৬ দশমিক ১ ভাগ বিভিন্ন মানসিক সমস্যাতে আক্রান্ত, যার বেশির ভাগই নারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়ঃসন্ধিকাল এমন একটি সময় যেখানে উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে মানসিক বিপর্যস্ততা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে মেয়েশিশুরা বেশি ভুক্তভোগী। নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি, বৈষম্য ও বয়:সন্ধিকালীন স্বল্প জ্ঞান ও যত্নের অভাব তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
বয়ঃসন্ধি হলো শৈশব ও সাবালকত্বের মধ্যবর্তী শারীরিক-মানসিক একটি ক্রান্তিকাল। এ সময় কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শিশুর শরীর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় ও প্রজনন-সক্ষমতা তৈরি হতে থাকে। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের জীবনের ১০-১৯ বছরের মধ্যবর্তী বয়সটাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলে। বয়ঃসন্ধিকালে প্রধানত দুই রকমের পরিবর্তন হয়, প্রথমটি শারীরিক ও দ্বিতীয়টি মানসিক। এই দুই ধরনের পরিবর্তনই প্রাকৃতিকভাবে হয়। এর মধ্যে শারীরিক পরিবর্তনগুলো বাইরে থেকে খেয়াল করা যায়। কিন্তু এসময় ছেলে-মেয়েদের যে মানসিক পরিবর্তন হয় তা কি খেয়াল করা হয়?

শরীরের পরিবর্তনের পাশাপাশি বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের মানসিকতায় কিছু পরিবর্তন আসে। ফলে তাদের দৈনন্দিন আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এই পরিবর্তনগুলো বয়ঃসন্ধিকালীন আচরণ এর অংশ। মানসিক পরিবর্তনের দিক থেকে ছেলে ও মেয়েতে কিছু অমিল থাকলেও মিলটাই বেশি থাকে। যেমন:

  •  শারীরিক পরিবর্তনের ফলে কিশোর-কিশোরীদের মনে নানা কৌতূহল, প্রশ্ন ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং মানসিক চাঞ্চল্য তৈরি হয়;
  •  নিজেদের শরীর, চেহারা, পোশাকআশাক, আচার-আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন হয়;
  •  প্রাকৃতিকভাবে দেহে তৈরি হওয়া হরমোনের প্রভাবে যৌনতাবিষয়ক চিন্তা মাথায় আসে;
  • বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি সহজাত কৌতূহল ও আকর্ষণ তৈরি হয়। অর্থাৎ কিশোররা কিশোরীদের ও কিশোরীরা কিশোরদের প্রতি  আগ্রহী হয়ে ওঠে;
  •  মন-মেজাজ ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কখনো অল্পেই খুশি হয়, কখনো-বা তুচ্ছ কারণেই দুঃখ পায়;
  • কেউ কেউ লাজুক ও আত্মকেন্দ্রিক হয়, কারো-বা অনেক বন্ধুবান্ধব থাকে;
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করে;
  • নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রায় সব বিষয়ে স্বাধীনতা দাবি করে;
  • প্রায়ই একাকিত্বে ভোগে।

বয়:সন্ধিকালীন কিশোরীদের যে শারীরিক পরিবর্তনগুলো হয় তার মধ্যে অন্যতম হল মাসিক। মাসিক মেয়েদের জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ও সন্তানধারণ ক্ষমতালাভের লক্ষণ। মেয়েদের তলপেটে জরায়ুর দু’পাশে দু’টি ছোট থলি থাকে যাকে ওভারি বা ডিম্বাশয় বলে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েদের ডিম্বাশয় থেকে প্রতিমাসে একটি করে ডিম বা ডিম্বাণু পরিপক্ক হয়। একে বলে ডিম্বস্ফোটন। পরে এই ডিম্বাণু ডিম্বনালির পথ দিয়ে দুই ডিম্বাশয়ের মাঝ খানে অবস্থিত জরায়ুতে এসে আশ্রয় নেয়। এই সময়ে জরায়ুতে ডিম্বানুকে ধরে রাখার জন্য রক্তে ভরা একটি পর্দা বা আস্তরন তৈরী হয়। এই অবস্থায় ডিম্বানু ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। এই সময়ের মধ্যে ডিম্বানু নিষিক্ত না হলে এই রক্তে ভরাপর্দা ও ডিম্বানু ফেটে যায় এবং যোনি পথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। এই ঘটনা ৩ দিন থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রত্যেক মাসে হয় বলে এই ঘটনাকেই মাসিক বা ঋতুস্্রাব বা রজ:স্রাব বা পিরিয়ড বা মেনস্ট্রুয়েশন বলে।

২০১৩ সালে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ওয়াটার এইড-এর সহায়তায় ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশ’ বা আইসিডিডিআর,বি ৭০০ স্কুলের ২,৩৩২ জন ছাত্রীর সাক্ষাৎকার নেয়। ছাত্রীদের ৬৪ শতাংশ জানায়, প্রথমবার মাসিক হওয়ার আগে তারা এ বিষয়ে মোটেই অবহিত ছিল না। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সার্ভে থেকে জানা যায়, দেশের ৪০ শতাংশ মেয়ে মাসিক ঋতুচক্রের সময়ে তিনদিন স্কুল যায় না এবং এই ৪০ শতাংশের তিনভাগের এক ভাগ মেয়ে জানিয়েছে, স্কুল কামাই দেওয়ার কারণে তাদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে মাসিক নিয়ে পরিবার তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন আলোচনা করা হয় না। এর ফলে প্রথম মাসিকের সময় অধিকাংশ মেয়েই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যেহেতু তার কাছে মাসিক সম্পর্কিত কোন তথ্য নেই, সেহেতু প্রথমেই সে ধরে নেয় তার বড় ধরণের কোন রোগ হয়েছে। লজ্জা বা সংকোচের কারণে সে তার বাব-মা বা অন্য কারও কাছে পরামর্শের জন্য যেতে পারে না। স্কুলের মধ্যে এ ধরণের ঘটনা আরও লজ্জার বিষয় কারণ সবাই হাসাহাসি করতে পারে। এই বিড়ম্বনা সে তার নিজের মধ্যে পুষে রাখে এবং হীনমন্যতায় ভোগে, যা তার অত্মবিশ্বাসে ঘাটতি ঘটায়। যখন তারা মাসিক বিষয়ে জানতে পারে তখন তার মনের ওপর আরও বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়। কারণ তার উপর আরোপিত হয় নানা রকম বিধি নিষেধ। সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণাগুলো তাকে চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলে। মাসিকের মতো একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ভুল ধারণা ও সঠিক জ্ঞানের অভাবে প্রতিমাসে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৈশোরের এই পর্যায়ে যখন একটি মেয়ের মানসিক বিকাশের সময়, তখন এই মানসিক চাপ তার আত্মবিশ্বাসের চিড় ধরায়।

মানসিক সুস্থতার মাধ্যমে একজন মানুষ সেই ক্ষমতা অর্জন করে, যা তাকে নিজের সঙ্গে এবং তার চারপাশে থাকা অন্যান্যদের সঙ্গে যুক্ত হতে বা একাত্ম হতে সাহায্য করে। সুতরাং মাসিককালীন শরীরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা যেমন জরুরি, তেমনি এ সময় মানসিক পরিচর্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই প্রথাগত ভুল ধারণাগুলো বদলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার আগেই মেয়েকে শেখাতে হবে যে, মাসিক প্রত্যেক মেয়ের জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং এতে ভয় এবং লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। প্রত্যেক নারীর জীবনেই এই ঘটনাটি ঘটে। মাসিক শুরু হলেই বুঝতে হয় যে সে মেয়ের সন্তান জন্মানোর ক্ষমতা হয়েছে। তবে মাসিক শুরু হওয়া মানেই বিয়ের বয়স হওয়া নয়। ২০ বছরের আগে মেয়েদের শরীর সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত হয় না। এ সময়ে শরীরের যত্ন ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তাকে পরিপূর্ণভাবে অবহিত করতে হবে। আগে থেকে তৈরী থাকার ব্যাপারে মেয়েকে সাহায্য করতে হবে। প্যাড কেনা বা অন্য বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে। বাড়িতে মেয়েদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন সুবিধা উন্নত করতে হবে। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। স্কুল ও কলেজে মাসিক বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি মাসিক বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে মাসিকের দিনগুলোতেও মেয়েরা আত্মবিশ্বাসের সাথে স্কুলে আসতে পারে। প্রথম মাসিকের আগেই তাকে মাসিক প্রস্তুত করতে হবে। মাসিক একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বিষয় হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য তাকে মানসিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক দিক দিয়ে বিচার করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের মতে স্বাস্থ্য হল শরীর, মন এবং সমাজের ভাল দিকগুলির মেলবন্ধন। এই ভাবনার সঙ্গে রোগ বা দুর্বলতার দিকটি যুক্ত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও বলেছে যে, সুচিন্তার অধিকারী মানুষ তার দক্ষতা বাড়াতে সব সময়ই সচেষ্ট, এই দক্ষতাই তাকে জীবনের বিপর্যয়গুলির মোকাবিলা করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে যাপনে ফিরে আসতে সাহায্য করে, উৎপাদনশীল কাজে সে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে এবং নিজের গোষ্ঠী ও সমাজের জন্যও অবদান রেখে যেতে পারে। মাসিকের সময় কিশোরীরা বিষন্নতায় ভুগতে পারে। অনেক সময় তারা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ঠিক এমন সময় অনেকে পরিবারের সহযোগিতা বা সার্পোট পায় না। যার কারনেই তারা আরো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সেই জন্য প্রয়োজন মানসিকভাবে তাদেরকে সমর্থন করা।