স্কুল হোক নিরাপদ





শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল মুক্তবুদ্ধির চর্চা কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল দিকগুলো বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। পরিবারের বাইরে আদর্শ চর্চার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হল স্কুল। যে কোন স্কুলের মনোরম পরিবেশ ও ইতিবাচক আবহ ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকাশকে সহায়তা করে। পাশাপাশি, স্কুলের ইতিবাচক পরিবেশ ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক এমনকি স্কুল কমিটির সদস্যরাও নিজেদেরকে স্কুলের সাথে আরও বেশি সম্পৃক্ত মনে করেন, যা পরবর্তীতে উন্নত শিক্ষার প্রসার ঘটায়। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।

২০১৪ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যবিধির ভিত্তি জরিপে বলা হয়েছে, ঋতুকালীন ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের এক-চতুর্থাংশ মাসে অন্তত তিন দিন স্কুলে যায় না। এই ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরী বিষয়। ২০১১ সালের সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারণ করা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি স্কুলে ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট থাকার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ভিত্তি জরিপে দেখা যায় যে, প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট পাওয়া গেছে যার ৫৫% তালাবন্ধ থাকে । যার কারণে দুই তৃতীয়াংশ টয়লেটের ভিতরে বা কাছাকাছি পানি ও সাবানের ব্যবস্থা থাকে না। এছাড়া টয়লেট সমূহের জানালা ছোট, পরিবেশ দুর্গন্ধযুক্ত থাকে এবং পানির কল অকেজো থাকে। বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও বিদ্যুতের সংযোগ নেই এবং আলো ও বাতাস চলাচল নাই, যা পরিবেশ নষ্ট করেছে। বিদ্যালয়ে টয়লেটের অব্যবস্থাপনা মেয়েদের স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির উপর বেশি প্রভাব ফেলে। ঋতুকালিন সময়ে বেশিরভাগ মেয়েরা স্কুলে উপস্থিত হতে পারে না। উপস্থিতির হার শতকরা ৮০ ভাগ না থাকায় উপবৃত্তি হতেও অনেক মেয়ে বঞ্চিত হয়।

মাসিককালীন সময়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যার সাথে স্যানিটারি টয়লেট জড়িত। আর এই সুবিধা না থাকায় আমাদের দেশে অনেক মেয়েই এই সময়ে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি এড়িয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়। জরায়ুমুখে চুলকানী থেকে শুরু করে নানারকম ইনফেকশন হয়ে থাকে যার কারণে অনেক সময় সারাজীবন ধরে ভুগতে হয়। বিদ্যালয়ে নিরাপদ ও পরিস্কার স্যানিটারি টয়লেট না থাকার করণে শিক্ষার্থীরা অনেকেই এই সময় বিদ্যালয়ে যায় না বা যেতে চায় না। ফলাফলস্বরূপ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, স্কুলের ফলাফল খারাপ হওয়া, বাল্যবিয়ে ইত্যাদি বড় ধরনের দূর্ঘটনাও ঘটে নিয়মিত। সুতরাং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এ কারণেই জেন্ডারবান্ধব স্যানিটেশন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় টয়লেট এমন হবে যেন-
– মাসিকের সময় যতবার প্রয়োজন ততবারই সম্পূর্ন গোপনীয়তার সাথে কাপড়/ ন্যাপকিন পরবির্তন করতে পারবে।
– পরিস্কার পানি ও সাবান দিয়ে নিজে সম্পূর্ন পরস্কিার হতে পারবে।
– ব্যবহৃত উপকরনগুলোর যথাযথ প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবে।
– টয়লেটের সাথে ব্যবহৃত উপকরণগুলো যথাস্থানে ফেলার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সকল বিদ্যালয়ে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি স্কুলের ছাত্রীদের মাসিককালীন, স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ ও পানিসরবরাহ বিধিস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে স্কুল স্যানিটেশন উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মেয়েদের বাথরুমে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকলে, বাথরুমে পরিচ্ছন্ন থাকেনা। মেয়েদের বাথরুমে অবশ্যই ছাদ থাকতে হবে এবং ভেতর থেকে আটকানোর ব্যবস্থাসহ দরজার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সর্বোপরি, স্কুলগুলোর স্যানিটেশন ব্যবস্থা হতে হবে জেন্ডার বান্ধব। কোনভাবেই যেন মেয়েরা টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে অস্বস্তিবোধ না করে। কিশোরীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে আমলে রাখতে হবে। মাসিককালীন সময়ে স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। যদি বিনামূল্যে ব্যবস্থা না করা যায়, অন্তত স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। টয়লেটে পরিষ্কার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাইপে পানি সরবরাহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। টয়লেট পরিচ্ছন্ন আছে কী না, সে বিষয়ে তদারকি করার জন্য গার্ল গাইডদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা যেতে পারে। তবে এই দলের নেতৃত্বে থাকবেন শিক্ষকরা। কিশোরীদের সুবিধার জন্য অবশ্যই প্রতিটি টয়লেটে প্লাস্টিকের ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরিষ্কার পানি এবং সাবানের ব্যবস্থাও রাখা জরুরি। মাসিক সম্পর্কে ছাত্রীদের সাথে কথা বলতে হবে। এর জন্য শিক্ষক নিজে দায়িত্ব নেবেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও মেধাবী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আর এজন্য এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। মাসিকের সময় যেন প্রতিটি মেয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে ও নিরাপদে তার ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।